বিপাকক্রিয়া বা মেটাবলিজম শরীরের ভেতরের একটি চলমান প্রক্রিয়া। খাবার থেকে শক্তি তৈরি, রক্তে শর্করার ভারসাম্য রাখা এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রমে এর ভূমিকা রয়েছে। মেটাবলিজমকে শুধু ওজন কমানো বা বাড়ানোর সঙ্গে যুক্ত করে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। প্রতিদিনের ঘুম, খাবার, শারীরিক পরিশ্রম ও বিশ্রামের অভ্যাসও বিপাকক্রিয়ার ওপর প্রভাব ফেলে।
দিনের শুরুটা হোক সচেতনভাবে
ঘুম থেকে ওঠার পরের কয়েক ঘণ্টা দিনের ছন্দ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ। সকালে প্রাকৃতিক আলোতে কিছু সময় থাকা, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং শরীরকে সক্রিয় করা ভালো অভ্যাস। সকালের খাবার খেলে তা যেন পরিমাণ ও পুষ্টিগুণের দিক থেকে ভারসাম্যপূর্ণ হয়, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
খাবারে থাকুক পুষ্টির ভারসাম্য
মেটাবলিজম ভালো রাখতে খাবারের ধরন গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রোটিন ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার রাখা যেতে পারে। শাকসবজি, ফল, ডাল, মাছ, ডিম, দুধ বা দুধজাত খাবার এবং অপেক্ষাকৃত কম প্রক্রিয়াজাত খাবার হতে পারে ভালো পছন্দ। একই সাথে অপ্রয়োজনীয় বারবার নাশতা করার অভ্যাস কমানো এবং খাওয়ার সময় খাবারের প্রতি মনোযোগী হওয়া উপকারী।
প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো জরুরি
শুধু কী খাচ্ছি তা নয়, খাবারটি কতটা প্রক্রিয়াজাত সেটিও বিবেচনার বিষয়। অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিবর্তে যতটা সম্ভব ঘরে তৈরি ও পুষ্টিকর খাবার বেছে নেওয়া ভালো। রঙিন ও বিভিন্ন ধরনের সবজি, মানসম্মত প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি খাদ্যতালিকায় রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে।
চলাফেরা বাড়াতে হবে
শরীরকে সক্রিয় রাখার জন্য শুধু নির্দিষ্ট সময়ে ব্যায়াম করাই যথেষ্ট নয়। দিনের মধ্যে হাঁটা, সিঁড়ি ব্যবহার, দীর্ঘ সময় বসে থাকার মাঝে বিরতি নেওয়া এসব ছোট ছোট অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত হাঁটার পাশাপাশি বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করা যেতে পারে। পেশির কার্যকারিতা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ ও সামগ্রিক বিপাকীয় স্বাস্থ্যের সাথে সম্পর্কিত।
ঘুম ও বিশ্রামও সমান গুরুত্বপূর্ণ
ব্যস্ত জীবনে ঘুমকে অবহেলা করার প্রবণতা আছে। অথচ পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম শরীরের পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত রাতে ৭–৯ ঘণ্টা মানসম্মত ঘুমের প্রয়োজন হয়। প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমানো, ঘুমের আগে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার কমানো এবং আরামদায়ক ঘুমের পরিবেশ তৈরি করা সহায়ক হতে পারে।
ব্যায়ামে থাকুক ধারাবাহিকতা
শরীরচর্চার সুফল পেতে নিয়মিততা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একদিন অনেক বেশি ব্যায়াম করে পরের কয়েক দিন নিষ্ক্রিয় থাকার চেয়ে নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী ধারাবাহিকভাবে সক্রিয় থাকা বেশি কার্যকর। হাঁটা, শক্তিবর্ধক ব্যায়াম কিংবা দৈনন্দিন শারীরিক কাজ সব মিলিয়েই একটি সক্রিয় জীবনযাপন তৈরি করা সম্ভব।
সব মিলিয়ে, মেটাবলিজমকে সুস্থ রাখার জন্য কোনো একক খাবার বা বিশেষ কৌশলের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। বরং দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আলো, পানি, সুষম খাবার, নিয়মিত চলাফেরা, পর্যাপ্ত ঘুম ও ধারাবাহিক শরীরচর্চা এই অভ্যাসগুলোর সমন্বয়ই দীর্ঘমেয়াদি বিপাকীয় স্বাস্থ্যের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন তাই কোনো সাময়িক ‘ডায়েট’ নয়; এটি প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তের সমষ্টি।
লেখক: রাইসা মেহজাবীন, ফিটনেস পুষ্টিবিদ
বি.এসসি (অনার্স), ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন, ডিইউ
এমপিএইচ (চলমান), পাবলিক হেলথ নিউট্রিশন, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
পিজিটি (Nutrition and Fitness Training), ইন্সপিরন ফিটনেস এন্ড ডায়েট কনসালটেন্সি সেন্টার
স্পেশালাইজড ইন ফিটনেস নিউট্রিশন ট্রেনিং, নিউট্রিশন সলিউশনস
ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ও ফিটনেস কোচ, ইন্সপিরন ফিটনেস এন্ড ডায়েট কনসালটেন্সি সেন্টার, ধানমন্ডি ব্রাঞ্চ
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), নিউট্রিশন ফর চেঞ্জ


