ওজন কমানোর অন্যতম সহজ ও কার্যকর উপায় হলো নিয়মিত হাঁটা। এটি ক্যালোরি খরচ বাড়াতে, শারীরিক সক্ষমতা উন্নত করতে এবং হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে হাঁটা থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে হলে কিছু সাধারণ ভুল এড়িয়ে চলা জরুরি। মনে রাখবেন শুধু হাঁটলেই হবে না, সঠিকভাবে হাঁটাও জরুরি।
অনেকেই হাঁটা শুরু করার পরপরই দীর্ঘ সময় হাঁটতে চান, অস্বাভাবিক বড় পদক্ষেপ নেন, ভুল জুতা ব্যবহার করেন কিংবা হাঁটার পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস ও ঘুমের দিকে যথেষ্ট নজর দেন না। এসব কারণে হাঁটার সুফল কমে যেতে পারে এবং কখনও কখনও আঘাতের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
১. হঠাৎ অতিরিক্ত হাঁটা
‘বেশি হাঁটলেই বেশি ওজন কমবে’—এ ধারণা সবসময় সঠিক নয়। দীর্ঘদিন শারীরিকভাবে কম সক্রিয় থাকার পর হঠাৎ অনেকক্ষণ বা খুব দ্রুত হাঁটা শুরু করলে পেশিতে ব্যথা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, ফোসকা কিংবা জয়েন্টে অস্বস্তি হতে পারে।
করণীয়: নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী ধীরে শুরু করুন। শরীর অভ্যস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটার সময় ও গতি বাড়ান।
২. ভুল ভঙ্গিতে হাঁটা
কুঁজো হয়ে হাঁটা, মাথা নিচু করে রাখা, কাঁধ শক্ত করে রাখা কিংবা শরীরকে অস্বাভাবিকভাবে সামনে বা পেছনে ঝুঁকিয়ে হাঁটা অস্বস্তি ও পেশিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সঠিক ভঙ্গি হলো— মাথা স্বাভাবিক ও সোজা রাখা, দৃষ্টি সামনে রাখা, কাঁধ শিথিল রাখা এবং পিঠকে স্বাভাবিক অবস্থায় রাখা।
৩. অস্বাভাবিক বড় পদক্ষেপ নেওয়া
দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করতে গিয়ে অনেকে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বড় পদক্ষেপ নেন। একে Overstriding বলা হয়।
এতে হাঁটার স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হতে পারে এবং পা, গোড়ালি ও হাঁটুর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে।
করণীয়: গতি বাড়াতে পদক্ষেপ অস্বাভাবিকভাবে বড় না করে স্বাভাবিক ছন্দে একটু দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করুন।
৪. ভুল জুতা পরা
হাঁটার সময় আরামদায়ক ও সঠিক মাপের জুতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খুব আঁটসাঁট, ঢিলা বা অস্বস্তিকর জুতা পায়ে চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং দীর্ঘ সময় হাঁটাকে কষ্টকর করে তুলতে পারে।
করণীয়: হাঁটার জন্য উপযোগী, সঠিক মাপের এবং পর্যাপ্ত সাপোর্টযুক্ত জুতা ব্যবহার করুন। জুতার কুশন ও সাপোর্ট নষ্ট হয়ে গেলে তা পরিবর্তন করুন।
৫. পানি কম পান করা
দীর্ঘ সময় হাঁটা বা গরম আবহাওয়ায় ব্যায়াম করার সময় শরীরে পানির ঘাটতি হতে পারে। এতে তৃষ্ণা, দুর্বলতা, ক্লান্তি ও মাথা ঘোরার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
করণীয়: সারাদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন। দীর্ঘ সময় হাঁটলে প্রয়োজন অনুযায়ী সঙ্গে পানিও রাখুন।
৬. হাতের নড়াচড়া ভুলভাবে করা
হাঁটার সময় হাত স্বাভাবিকভাবে সামনে-পেছনে নড়াচড়া করলে শরীরের ভারসাম্য ও হাঁটার ছন্দ বজায় রাখতে সাহায্য করে। হাত একেবারে স্থির রাখা বা অতিরিক্ত জোরে দোলানো—দুটিই অস্বস্তিকর হতে পারে।
করণীয়: কনুই সামান্য ভাঁজ করে হাতকে স্বাভাবিকভাবে সামনে-পেছনে দোলাতে দিন।
৭. শুধু হাঁটার ওপর নির্ভর করা
ওজন কমানোর ক্ষেত্রে হাঁটা গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু হাঁটলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। খাদ্য থেকে অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ করলে নিয়মিত হাঁটার পরও ওজন কমানো কঠিন হতে পারে।
করণীয়: হাঁটার পাশাপাশি পরিমাণমতো খাবার, পর্যাপ্ত শাকসবজি, ফল, প্রোটিন ও আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ করুন এবং অতিরিক্ত চিনি ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার সীমিত করুন।
৮. ঘুমকে অবহেলা করা
ওজন নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত ঘুমও গুরুত্বপূর্ণ। অপর্যাপ্ত বা অনিয়মিত ঘুম ক্ষুধা ও খাবারের প্রতি আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলতে পারে।
করণীয়: অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য প্রতি রাতে ৭–৯ ঘণ্টা ঘুমের লক্ষ্য রাখা ভালো।
৯. খুব দ্রুত ফলাফল আশা করা
কয়েক দিন হাঁটার পরই ওজনের বড় পরিবর্তন আশা করা ঠিক নয়। স্বাস্থ্যকর ও টেকসই ওজন কমানো সাধারণত ধীরে ধীরে হয়।
একদিন অনেকক্ষণ হাঁটার চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস তৈরি করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
১০. ব্যথা বা অস্বস্তি উপেক্ষা করা
হাঁটার পর সামান্য ক্লান্তি স্বাভাবিক। কিন্তু তীব্র ব্যথা, মাথা ঘোরা, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিলে তা উপেক্ষা করা উচিত নয়।
এ ধরনের উপসর্গ হলে হাঁটা বন্ধ করে প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
শেষ কথা
ওজন কমানোর জন্য হাঁটা একটি সহজ ও কার্যকর অভ্যাস। তবে কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে নিয়মিত হাঁটার পাশাপাশি সঠিক ভঙ্গি, আরামদায়ক জুতা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি, ভালো ঘুম এবং ধীরে ধীরে অগ্রগতি—সবকিছুর দিকে নজর দিতে হবে।
হাঁটুন নিয়মিত, খাবারে সচেতন থাকুন এবং ফলাফলের জন্য সময় দিন। স্বাস্থ্যকর ওজন কমানোর মূল চাবিকাঠি হলো ধারাবাহিকতা—অতিরিক্ত পরিশ্রম নয়।
পুষ্টিবিদ লিনা আকতার
রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল এন্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর।


