শিশুর পুষ্টি শিক্ষা: শুধু বই নয়, রান্নাঘরও হোক শ্রেণিকক্ষ

Share

শিশুকে স্বাস্থ্যকর খাবার সম্পর্কে শেখানোর প্রচলিত পদ্ধতিতে ‘কী খেতে হবে’ এই প্রশ্নটিই বেশি গুরুত্ব পায়। সুষম খাদ্য কী, কোন খাবারে কোন পুষ্টি উপাদান আছে, ফল ও সবজি কেন খেতে হবে এসব বিষয় পাঠ্যবই, শ্রেণিকক্ষ কিংবা স্বাস্থ্যশিক্ষার আলোচনায় থাকে। কিন্তু পুষ্টি সম্পর্কে জানার সঙ্গে সেই জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার সক্ষমতার মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, তা অনেক সময় আলোচনার বাইরে থেকে যায়।

একটি শিশু জানে যে সবজি স্বাস্থ্যকর। কিন্তু সে কি সবজি নির্বাচন করতে পারে? খাবারের উপকরণ পরিমাপ করতে পারে? নিরাপদভাবে খাবার প্রস্তুত করতে পারে? নিজের জন্য সহজ ও পুষ্টিকর একটি খাবার তৈরির আত্মবিশ্বাস তার আছে কি?

এই প্রশ্নগুলোই food literacy বা খাদ্য-সাক্ষরতার আলোচনাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে।

২০২৬ সালে BMC Nutrition-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের হাতে-কলমে রান্নাভিত্তিক শিক্ষা food literacy-এর বিভিন্ন দক্ষতা উন্নত করতে ভূমিকা রাখতে পারে। কানাডার University of Ottawa-ভিত্তিক একটি culinary summer camp-এ ৮ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের নিয়ে পরিচালিত ওই গবেষণায় ৮৮ জন শিশু অংশ নেয়। তাঁদের মধ্যে ৮৫ জনের pre–post data বিশ্লেষণ করা হয়।

গবেষণার বিশেষত্ব ছিল, শিশুদের শুধু পুষ্টি সম্পর্কে তথ্য দেওয়া হয়নি। তাঁদের খাবার প্রস্তুত করার বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শেখানো হয়েছে। এক সপ্তাহে তারা ১২টি recipe প্রস্তুত করেছে। এর সঙ্গে ছিল হাত ধোয়া, food safety, উপকরণ পরিমাপ, রান্নাঘরের সরঞ্জাম নিরাপদে ব্যবহার, food origins, food waste এবং nutrition education-সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম।

গবেষণায় food literacy-এর ছয়টি ক্ষেত্রে পরিবর্তন মূল্যায়ন করা হয় স্বনির্ভরতা, রান্নাঘরের সরঞ্জাম ব্যবহারের সক্ষমতা ও নিরাপত্তা, উপকরণ পরিমাপ, hygiene, অন্যদের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা এবং cooking confidence। গবেষকেরা সব কটি ক্ষেত্রেই পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ উন্নতি লক্ষ্য করেছেন।

এই ফলাফল থেকে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্টভাবে আলোচনায় আসতে পারে পুষ্টিশিক্ষা শুধু তথ্য দেওয়ার বিষয় নয়; এটি দক্ষতা তৈরিরও বিষয়।

আমাদের দেশে শিশুদের পুষ্টিশিক্ষার বড় একটি অংশ এখনো তথ্যকেন্দ্রিক। শিশুকে বলা হয়, সুষম খাবার খেতে হবে; ফল ও সবজি খেতে হবে; অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। এসব পরামর্শ অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু পরামর্শ তখনই দীর্ঘস্থায়ী আচরণে রূপ নিতে পারে, যখন তার সঙ্গে বাস্তব জীবনের দক্ষতাও যুক্ত হয়।

ধরা যাক, একটি শিশু জানে যে সকালের নাশতা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ব্যস্ত সকালে কীভাবে সহজ একটি পুষ্টিকর নাশতা তৈরি করা যায়, সে বিষয়ে তার কোনো ধারণা নেই। অথবা সে জানে, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া উচিত; কিন্তু প্যাকেটজাত খাবারের লেবেল কীভাবে পড়তে হয়, সেটি জানে না। সে জানে, খাবার নিরাপদ হওয়া জরুরি; কিন্তু রান্নার আগে হাত ধোয়া, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা কিংবা খাবার সংরক্ষণের মৌলিক নিয়মগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করতে শেখেনি।

এখানেই practical food education-এর প্রয়োজনীয়তা।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে ভাবা দরকার। আমাদের খাদ্যসংস্কৃতি বৈচিত্র্যময় এবং স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায় এমন বহু পুষ্টিকর খাবার রয়েছে। ডাল, শাকসবজি, মাছ, ডিম, দুধ, ফল, বিভিন্ন শস্য ও স্থানীয় অন্যান্য খাবারকে কেন্দ্র করে শিশুদের খাদ্য ও পুষ্টি শেখানো সম্ভব। এর জন্য সব স্কুলে বড় ধরনের রান্নাঘর বা বিশেষ অবকাঠামো প্রয়োজন হবে এমনটিও নয়। বয়স উপযোগী ছোট ছোট কার্যক্রম দিয়েও শুরু করা যেতে পারে।

শিশুদের স্থানীয় ও মৌসুমি খাবার চেনানো, খাবারের উপকরণ মাপতে শেখানো, হাত ধোয়া ও food hygiene অনুশীলন করানো, সহজ স্বাস্থ্যকর snack প্রস্তুত করতে দেওয়া, food label পড়ার প্রাথমিক ধারণা দেওয়া কিংবা খাবারের অপচয় কমানোর বিষয়ে হাতে-কলমে শেখানো এসব কার্যক্রম পুষ্টিশিক্ষাকে আরও বাস্তবমুখী করতে পারে।

তবে নতুন কোনো গবেষণার ফলাফলকে বাংলাদেশের বাস্তবতায় সরাসরি প্রয়োগ করার আগে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। আলোচ্য গবেষণাটি ছিল single-arm pre–post exploratory study; অর্থাৎ একই অংশগ্রহণকারীদের intervention-এর আগে ও পরে তুলনা করা হয়েছে, কিন্তু আলাদা control group ছিল না। ফলে পরিবর্তনের সম্পূর্ণ কারণ যে intervention-ই, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। গবেষণাটি একটি নির্দিষ্ট summer camp-এর পরিবেশেও পরিচালিত হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের সামাজিক ও শিক্ষাগত বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশের শিশুদের সঙ্গে পুরোপুরি তুলনীয় নয়। দীর্ঘমেয়াদে এই দক্ষতাগুলো কতটা স্থায়ী হয়, সেটিও আরও গবেষণার বিষয়।

তবু গবেষণাটির মূল প্রশ্নটি আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক: শিশুকে আমরা শুধু খাবার সম্পর্কে জানাব, নাকি খাবারের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় দক্ষতাও শেখাব?

পুষ্টিশিক্ষাকে যদি দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে দ্বিতীয় প্রশ্নটির গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কারণ খাদ্যাভ্যাস কেবল জ্ঞানের ওপর নির্ভর করে না। পরিবার, পরিবেশ, খাদ্যের প্রাপ্যতা, আর্থিক সক্ষমতা, সামাজিক সংস্কৃতি এবং খাবার প্রস্তুতের দক্ষতাও সেখানে ভূমিকা রাখে।

তাই স্কুলভিত্তিক পুষ্টিশিক্ষার পরিধি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। পাঠ্যবইয়ে খাদ্যগোষ্ঠীর ছবি থাকা প্রয়োজন, কিন্তু তার পাশাপাশি বাস্তব খাবার, রান্নাঘরের নিরাপত্তা, খাবার নির্বাচন এবং খাদ্য প্রস্তুতির অভিজ্ঞতাও শিক্ষার অংশ হতে পারে।

শিশুকে শুধু বলা ‘সবজি খাও’ সহজ। কিন্তু তাকে যদি শেখানো হয় কীভাবে একটি সবজি পরিষ্কার করতে হয়, কীভাবে নিরাপদে প্রস্তুত করতে হয় এবং কীভাবে সেটিকে একটি সুষম খাবারের অংশ করা যায়, তাহলে সেই শিক্ষা আরও অর্থবহ হতে পারে।

পুষ্টিশিক্ষার লক্ষ্য শুধু জ্ঞানী শিশু তৈরি করা নয়; এমন মানুষ তৈরি করা, যারা সেই জ্ঞানকে জীবনের সিদ্ধান্তে প্রয়োগ করতে পারে।

সে কারণে ভবিষ্যতের পুষ্টিশিক্ষায় শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি রান্নাঘর, স্কুলের বাগান, বাজার কিংবা খাবারের টেবিল সবই হতে পারে শেখার জায়গা। শিশুর খাদ্যাভ্যাস বদলাতে শুধু উপদেশ নয়, প্রয়োজন অভিজ্ঞতা, অনুশীলন এবং আত্মবিশ্বাস।

একটি শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া জরুরি। তবে স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যৎ গড়তে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার হাতে একটি চামচ, একটি মাপার কাপ কিংবা একটি নিরাপদ রান্নার সরঞ্জামও তুলে দিতে হতে পারে।

কারণ স্বাস্থ্যকর খাবার সম্পর্কে জানা গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সেই জ্ঞান দিয়ে স্বাস্থ্যকর খাবার তৈরি ও বেছে নেওয়ার সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত আরও বড় সম্পদ।

রাইসা মেহজাবীন
ফিটনেস পুষ্টিবিদ
বি.এসসি (অনার্স), ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন, ডিইউ
এমপিএইচ (চলমান), পাবলিক হেলথ নিউট্রিশন, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
পিজিটি (Nutrition and Fitness Training), ইন্সপিরন ফিটনেস এন্ড ডায়েট কনসালটেন্সি সেন্টার
স্পেশালাইজড ইন  ফিটনেস নিউট্রিশন ট্রেনিং, নিউট্রিশন সলিউশনস
ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ও ফিটনেস কোচ, ইন্সপিরন ফিটনেস এন্ড ডায়েট কনসালটেন্সি সেন্টার, ধানমন্ডি ব্রাঞ্চ
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), নিউট্রিশন ফর চেঞ্জ

Share this news as a Photo Card

Share

সর্বশেষ সংবাদ

Don't Miss

নারীদের হৃদরোগ বাড়ছে কেন? জেনে নিন লক্ষণ ও প্রতিকার

সাধারণত মনে করা হয় হার্টের অসুখ কেবল পুরুষদেরই বেশি হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা বলছে উল্টো কথা—পুরুষদের তুলনায় নারীদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি এখন...

হামের উপসর্গ নিয়ে রাজশাহী মেডিকেলে মারা যাওয়া শিশুর সংখ্যা বেড়ে ৫০

প্রতিদিনই বাড়ছে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা। চলতি বছরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া শিশুর সংখ্যা...

Related Articles

বিপাকক্রিয়া ঠিক রাখতে আপনার প্রতিদিনের জীবনযাপন কেমন হওয়া উচিত?

বিপাকক্রিয়া বা মেটাবলিজম শরীরের ভেতরের একটি চলমান প্রক্রিয়া। খাবার থেকে শক্তি তৈরি,...

নারীর নীরব ঘাতক এন্ডোমেট্রিওসিস: লক্ষণ, কারণ, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা

আমাদের মেয়েদের জরায়ুর সবচেয়ে ভেতরের স্তরের নাম এন্ডোমেট্রিয়াম যেখানে ভ্রুন প্রতিস্থাপিত হয়ে...

04 October 2026

শিশুর পুষ্টি শিক্ষা: শুধু বই নয়, রান্নাঘরও হোক শ্রেণিকক্ষ

Shastho.TV |
ShasthoTV
ShasthoTV