দিনের শুরুটা হয় ব্যস্ততা দিয়ে। অফিস, পড়াশোনা, সংসার, অর্থনৈতিক চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে মনের ওপর তৈরি হয় নানা ধরনের চাপ। কখনো এই চাপ সাময়িক, আবার কখনো তা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে আমাদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতাকে প্রভাবিত করে। এই অবস্থাকেই সাধারণভাবে বলা হয় ইমোশনাল স্ট্রেস বা মানসিক চাপ।
স্ট্রেস পুরোপুরি এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়। তবে জীবনযাপনের কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করে এর প্রভাব অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এর মধ্যে সুষম খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্ট্রেস হলে শরীরে কী ঘটে?
মানসিক চাপের সময় শরীর স্বাভাবিকভাবেই ‘স্ট্রেস রেসপন্স’ তৈরি করে। এ সময় কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোনের মাত্রা বাড়তে পারে। ফলে হৃদ্স্পন্দন বেড়ে যাওয়া, পেশিতে টান, ঘুমের সমস্যা, অস্থিরতা, মনোযোগ কমে যাওয়া কিংবা ক্ষুধার পরিবর্তনের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত স্ট্রেস থাকলে খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আসে। কেউ বেশি খেতে শুরু করেন, কেউ আবার খাবারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। অনেকের ক্ষেত্রে মিষ্টি, ফাস্টফুড বা অতিরিক্ত ক্যাফেইনযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়ে। তাই স্ট্রেস মোকাবিলায় খাবারের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
খাবারের প্লেটে কী থাকবে?
স্ট্রেস কমানোর জন্য কোনো একটি বা দুইটি খাবার যথেষ্ট নয় বরং নিয়মিত ও সুষম খাবারই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, খাবারে পর্যাপ্ত শর্করা, প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি, ভিটামিন, খনিজ ও আঁশ নিশ্চিত করতে হবে। ভাত বা রুটির সঙ্গে মাছ, ডিম, ডাল, মুরগি কিংবা অন্যান্য প্রোটিনের উৎস রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও মৌসুমি ফল খাওয়ার অভ্যাস করা ভালো।
ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডসমৃদ্ধ মাছ, যেমন ইলিশ, সার্ডিন বা অন্যান্য তৈলাক্ত মাছ খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। বাদাম ও বীজও স্বাস্থ্যকর চর্বির ভালো উৎস। তবে পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
পানি পান করাও গুরুত্বপূর্ণ। শরীরে পানিশূন্যতা হলে ক্লান্তি, মাথাব্যথা ও মনোযোগের সমস্যা দেখা দিতে পারে, যা অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
অন্যদিকে অতিরিক্ত চিনি, কোমল পানীয়, অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস কমানো দরকার। অতিরিক্ত চা-কফি, বিশেষ করে দিনের শেষভাগে, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। আর ঘুমের সমস্যা হলে স্ট্রেস সামলানো আরও কঠিন হয়ে যায়।
ব্যায়াম কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
স্ট্রেসের সময় শরীরকে নড়াচড়ায় রাখা অনেকের জন্য কার্যকর একটি অভ্যাস। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম শরীরের সামগ্রিক সুস্থতা বাড়ানোর পাশাপাশি মেজাজ ও ঘুমের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ব্যায়াম মানেই প্রতিদিন জিমে গিয়ে কঠিন ওয়ার্কআউট করা নয়। দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার, যোগব্যায়াম, নাচ কিংবা হালকা স্ট্রেচিং যে কোনো উপযোগী শারীরিক কার্যক্রম দিয়ে শুরু করা যায়।
যারা দীর্ঘ সময় বসে কাজ করেন, তাঁরা প্রতি কিছুক্ষণ পরপর উঠে কয়েক মিনিট হাঁটতে পারেন। প্রতিদিনের ব্যস্ততার মধ্যেও ২০–৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটার মতো সহজ অভ্যাস তৈরি করা যেতে পারে। পরে ধীরে ধীরে সময় ও মাত্রা বাড়ানো সম্ভব।
তবে দীর্ঘদিন ব্যায়াম না করা ব্যক্তি হঠাৎ অতিরিক্ত কঠিন ব্যায়াম শুরু না করাই ভালো। বয়স, শারীরিক সক্ষমতা ও বিদ্যমান স্বাস্থ্যগত অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যায়ামের ধরন নির্বাচন করা উচিত।
খাবার ও ব্যায়ামের সঙ্গে ঘুমও জরুরি
স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণের আলোচনায় ঘুমকে বাদ দেওয়া যায় না। অনিয়মিত ঘুম মানসিক চাপ সামলানোর ক্ষমতাকে আরও দুর্বল করতে পারে। তাই প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো, ঘুমের আগে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার কমানো এবং রাতে ভারী খাবার এড়িয়ে চলার অভ্যাস করা ভালো।
একই সঙ্গে নিজের জন্য কিছু সময় রাখাও জরুরি। বই পড়া, গান শোনা, পরিবারের সঙ্গে কথা বলা, প্রিয় কোনো কাজ করা কিংবা কিছুক্ষণ নিরিবিলি হাঁটা এসব ছোট অভ্যাসও মানসিক স্বস্তি দিতে পারে।
শুধু খাবার আর ব্যায়ামেই সব সমস্যার সমাধান নয়
স্ট্রেস একটি স্বাভাবিক মানবিক অভিজ্ঞতা। কিন্তু যদি দীর্ঘদিন ধরে মন খারাপ, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, ঘুমের গুরুতর সমস্যা, দৈনন্দিন কাজে আগ্রহ কমে যাওয়া বা স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটে, তাহলে শুধু খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামের ওপর নির্ভর না করে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সুস্থ থাকার জন্য তাই কোনো একক সমাধানের খোঁজ না করে জীবনযাপনের সামগ্রিক চিত্রের দিকে নজর দেওয়া দরকার। সুষম খাবার, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং প্রয়োজনে পেশাদার সহায়তা এই চারটি বিষয় মানসিক সুস্থতার যত্নে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
স্ট্রেসকে জীবনের বাইরে রাখা সম্ভব নয়। তবে স্ট্রেসের সঙ্গে কীভাবে স্বাস্থ্যকরভাবে মোকাবিলা করা যায়, সেটি শেখা সম্ভব। আর সেই পরিবর্তন শুরু হতে পারে প্রতিদিনের খাবারের প্লেট ও কয়েক মিনিটের হাঁটা থেকেই।
রাইসা মেহজাবীন
ফিটনেস পুষ্টিবিদ
বি.এসসি (অনার্স), ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন, ডিইউ
এমপিএইচ (চলমান), পাবলিক হেলথ নিউট্রিশন, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
পিজিটি (Nutrition and Fitness Training), ইন্সপিরন ফিটনেস এন্ড ডায়েট কনসালটেন্সি সেন্টার
স্পেশালাইজড ইন ফিটনেস নিউট্রিশন ট্রেনিং, নিউট্রিশন সলিউশনস
ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ও ফিটনেস কোচ, ইন্সপিরন ফিটনেস এন্ড ডায়েট কনসালটেন্সি সেন্টার, ধানমন্ডি ব্রাঞ্চ
চিফ নিউট্রিশন কনসালটেন্ট ও ফিটনেস ট্রেইনার
ইয়োগা ফাউন্ডেশন বসুন্ধরা
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), নিউট্রিশন ফর চেঞ্জ


