পর্যাপ্ত পানি পান না করলে শুধু তৃষ্ণাই নয়, মানসিক চাপের সময় শরীরের হরমোনগত প্রতিক্রিয়াতেও পরিবর্তন আসতে পারে। নতুন এক গবেষণায় এমনই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
সারাদিনের ব্যস্ততায় অনেকেই পানি পান করার কথা ভুলে যান। তৃষ্ণা না লাগলে পানি পান করার প্রয়োজন নেই—এমন ধারণাও প্রচলিত। কিন্তু শরীরে পানির ঘাটতি হলে এর প্রভাব শুধু মুখ শুকিয়ে যাওয়া বা প্রস্রাবের রং গাঢ় হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। মানসিক চাপের সময় শরীর কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তার সঙ্গেও পর্যাপ্ত পানি পান করার সম্পর্ক থাকতে পারে।
২০২৫ সালে Journal of Applied Physiology-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা নিয়মিত কম পরিমাণে তরল পান করেন এবং যাঁদের hydration বা শরীরে পানির ভারসাম্য তুলনামূলক কম ছিল, তাঁদের তীব্র মানসিক চাপের সময় কর্টিসলের প্রতিক্রিয়া বেশি ছিল। গবেষণাটি করেছেন যুক্তরাজ্যের Liverpool John Moores University এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা।
কীভাবে করা হয়েছিল গবেষণাটি?
গবেষণায় প্রথমে ৬২ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ককে স্ক্রিনিং করা হয়। সেখান থেকে ৩২ জনকে গবেষণার জন্য নির্বাচন করা হয়। তাঁদের মধ্যে ১৬ জন নিয়মিত কম তরল পান করতেন গড়ে প্রতিদিন ১ দশমিক ৩ লিটার। অন্য ১৬ জনের দৈনিক তরল গ্রহণ ছিল গড়ে ৪ দশমিক ৪ লিটার।
দুই দলের বয়স, উদ্বেগের মাত্রা, ঘুমের মান ও perceived stress-এর মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি ছিল। সাত দিন তাঁদের তরল গ্রহণ পর্যবেক্ষণের পর অংশগ্রহণকারীদের একটি standardised মানসিক চাপের পরীক্ষা Trier Social Stress Test করানো হয়। এর আগে ও পরে লালার নমুনা সংগ্রহ করে কর্টিসলের মাত্রা পরিমাপ করা হয়। পাশাপাশি প্রস্রাবের ঘনত্ব ও রং ব্যবহার করে hydration status ও মূল্যায়ন করা হয়।
উদ্বেগ ও হৃদ্স্পন্দনে পার্থক্য ছিল না, কিন্তু কর্টিসলে ছিল
গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দুই দলের মানুষই stress test-এর সময় প্রায় একই রকম উদ্বেগ অনুভব করেছেন এবং তাঁদের হৃদ্স্পন্দনও একইভাবে বেড়েছে।
কিন্তু কর্টিসলের ক্ষেত্রে পার্থক্য দেখা যায়। কম তরল গ্রহণকারী দলের stress response এর সময় কর্টিসল বৃদ্ধির মাত্রা ছিল গড়ে ৬ দশমিক ২ nmol/L, যেখানে বেশি তরল গ্রহণকারী দলের ক্ষেত্রে তা ছিল ৪ দশমিক ০ nmol/L। অর্থাৎ গবেষণায় ব্যবহৃত এই নির্দিষ্ট পরিমাপে দুই দলের cortisol reactivity-এর মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশ পার্থক্য ছিল।
গবেষণাটি বলছে, কম তরল গ্রহণ ও অপর্যাপ্ত hydration থাকা ব্যক্তিদের acute stress-এর সময় cortisol response তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
কেন এমন হতে পারে?
পানি ও স্ট্রেস-হরমোনের মধ্যে একটি সম্ভাব্য শারীরবৃত্তীয় সংযোগ রয়েছে। শরীরে পানির ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে arginine vasopressin (AVP) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই হরমোনের সঙ্গে hypothalamic-pituitary-adrenal বা HPA axis-এরও সম্পর্ক রয়েছে। HPA axis সক্রিয় হলে ACTH-এর মাধ্যমে adrenal gland থেকে কর্টিসল নিঃসরণ বাড়তে পারে।
গবেষণায় কম তরল গ্রহণকারী দলের copeptin যা AVP নিঃসরণের একটি surrogate marker তুলনামূলক বেশি ছিল। গবেষকেরা মনে করছেন, শরীরে পানির ঘাটতির সঙ্গে যুক্ত এই hormonal pathway stress-এর সময় বেশি cortisol response-এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে। তবে এটি এখনো একটি সম্ভাব্য প্রক্রিয়া, চূড়ান্ত কারণ-প্রমাণ নয়।
আগের গবেষণাগুলোও কী বলছে?
২০২০ সালের একটি systematic review ও meta-analysis-এ ২১টি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। সেখানে hypohydration-এর সঙ্গে cortisol বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে গবেষণাগুলোর মধ্যে যথেষ্ট বৈচিত্র্য ছিল এবং অনেক গবেষণায় exercise, heat exposure বা অন্যান্য stressor ব্যবহার করে dehydration তৈরি করা হয়েছিল। ফলে শুধু পানির ঘাটতির কারণে cortisol কতটা বাড়ে, তা নির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন।
এ কারণেই ২০২৫ সালের গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে স্বাভাবিক জীবনযাপনে অভ্যাসগতভাবে কম বা বেশি তরল গ্রহণকারী মানুষদের নিয়ে কাজ করা হয়েছে এবং একটি নির্দিষ্ট psychosocial stress test ব্যবহার করা হয়েছে। তবে গবেষণায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা মাত্র ৩২ জন এবং তাঁদের বয়স ছিল মূলত ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। ফলে একই ফলাফল সব বয়সী মানুষ বা সব ধরনের স্বাস্থ্যগত অবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া যাবে না।
তাহলে দিনে কতটুকু পানি পান করবেন?
পানি পানের প্রয়োজন সবার জন্য এক নয়। বয়স, শরীরের আকার, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, আবহাওয়া, ঘাম এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর তরলের প্রয়োজন নির্ভর করে।
তাই নির্দিষ্ট একটি সংখ্যাকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক নিয়ম হিসেবে না দেখে পর্যাপ্ত hydration বজায় রাখাই মূল কথা। গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া কিংবা বেশি শারীরিক পরিশ্রমের সময় তরলের প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, কিডনি, হৃদ্যন্ত্র বা শরীরে পানি ও লবণের ভারসাম্যজনিত কোনো সমস্যা থাকলে নিজের ইচ্ছায় অতিরিক্ত পানি পান করাও ঠিক নয়। এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তরল গ্রহণ করা উচিত।
মানসিক চাপের সময় কর্টিসল বাড়া শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু নতুন গবেষণাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, শরীরে পানির ঘাটতি থাকলে এই stress response আরও তীব্র হতে পারে।
তবে বিষয়টি নিয়ে এখনো গবেষণা প্রয়োজন।
বর্তমান প্রমাণ থেকে বলা যায়, পর্যাপ্ত hydration শরীরের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং মানসিক চাপের সময় শরীরের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকতে পারে।
তথ্যসূত্র: Kashi DS, et al. Habitual fluid intake and hydration status influence cortisol reactivity to acute psychosocial stress. Journal of Applied Physiology. 2025;139(3):698–708. DOI: 10.1152/japplphysiol.00408.2025.
রাইসা মেহজাবীন
ফিটনেস পুষ্টিবিদ
বি.এসসি (অনার্স), ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন, ডিইউ
এমপিএইচ (চলমান), পাবলিক হেলথ নিউট্রিশন, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
পিজিটি (Nutrition and Fitness Training), ইন্সপিরন ফিটনেস এন্ড ডায়েট কনসালটেন্সি সেন্টার
স্পেশালাইজড ইন ফিটনেস নিউট্রিশন ট্রেনিং, নিউট্রিশন সলিউশনস
ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ও ফিটনেস কোচ, ইন্সপিরন ফিটনেস এন্ড ডায়েট কনসালটেন্সি সেন্টার, ধানমন্ডি ব্রাঞ্চ
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), নিউট্রিশন ফর চেঞ্জ


