দেশে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে উল্লেখ করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, হৃদরোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, তামাক নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মিরপুরে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অডিটোরিয়ামে বিশ্ব হার্ট দিবস ২০২৬ উপলক্ষ্যে আয়োজিত ‘প্রতিটি হৃদ্স্পন্দনই জীবন’ শীর্ষক গণমুখী সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হৃদরোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসাসেবা মানুষের কাছে আরও সহজলভ্য করতে সরকারের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের আরও কাছাকাছি নিতে দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ থেকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে ১০টি এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে ৫০টি ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে ঢাকার হাসপাতালগুলোর ওপর রোগীর চাপ কিছুটা কমবে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ নিজ এলাকাতেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, স্বাস্থ্য খাতকে গুরুত্ব দিয়ে এবার সর্বোচ্চ বাজেট দেওয়া হয়েছে। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করার ওপরও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে দেশব্যাপী নার্স নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং নির্বাচিতদের পুলিশ ভেরিফিকেশন চলছে। চিকিৎসক নিয়োগসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি দেশে এইচআইভি সংক্রমণ বৃদ্ধির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা মোকাবিলায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তার মতে, হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সব পর্যায় থেকে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্যে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যাপক ফজিলা-তুন-নেসা মালিক বলেন, বিশ্বে প্রতিবছর ২ কোটি ৫ লাখের বেশি মানুষ কার্ডিওভাসকুলার রোগে মারা যান। বিশ্ব হার্ট ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, এসব রোগের প্রায় ৮০ শতাংশই প্রতিরোধযোগ্য। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি ঝুঁকির কারণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগকে গুরুত্ব দিতে হবে। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন গবেষণা, জনসচেতনতা ও অ্যাডভোকেসির মাধ্যমে সারা বছর হৃদরোগ প্রতিরোধে কাজ করছে।
মূল প্রবন্ধে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, হৃদরোগ প্রতিরোধ শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতার ওপর নির্ভর করে না; এর জন্য কার্যকর জনস্বাস্থ্য নীতি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি তামাক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের পাশাপাশি তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০২৬-এর বিধিমালা দ্রুত প্রণয়ন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী লবণ গ্রহণ সীমিত করার প্রস্তাব দেন।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, হৃদরোগ প্রতিরোধে শুরু থেকেই ঝুঁকির বিষয়গুলো চিহ্নিত করা জরুরি। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও তামাক ব্যবহারের মতো ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা গেলে হৃদরোগের প্রকোপ অনেকটাই কমানো সম্ভব। এ জন্য স্বাস্থ্যশিক্ষা ও জনসচেতনতার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী বলেন, হৃদরোগ প্রতিরোধে স্বাস্থ্য খাতের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তামাকমুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ই-সিগারেটসহ নতুন ধরনের নিকোটিনজাত পণ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন জরুরি।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. খন্দকার আব্দুল আউয়াল রিজভী বলেন, হৃদরোগ প্রতিরোধে শুধু চিকিৎসাসেবার ওপর নির্ভর করলে হবে না; রোগের ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন। তামাক ব্যবহার, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা হৃদরোগের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। এসব ঝুঁকি কমাতে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি কার্যকর জনস্বাস্থ্য নীতি ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।


