জেনে রাখুন, সুস্থ থাকুননির্বাচিতরোগ ও সমস্যা

কান পচা, কান পাকা রোগের লক্ষণ ও চিকিৎসা

Share
Share

কান মানবদেহের খুবই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। ভারসাম্য রক্ষা ও শ্রবণ ছাড়াও কানের স্বাভাবিক গঠন আমাদের চেহারার অংশ। তাই এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যত্নবান হওয়া উচিত। কানের দুটি সাধারণ রোগ হলো কান পচা ও কান পাকা। কানপাকা বলতে আমরা মধ্যকর্ণের দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণকে বুঝি। কানপাকা রোগের চিকিৎসায় অবহেলা করা উচিত নয়।

কান পচা ও কান পাকা শুনতে একই রকম মনে হলেও বাস্তবে এ দুটি কিছুটা ভিন্ন বিষয়। কান পাকা বলতে বোঝায় মধ্যকর্ণের সংক্রমণ। অর্থাৎ কানে পর্দার পেছনে সংক্রমণ। আর কান পচা হলো কানের বাইরের অংশ অর্থাৎ যেটা আমরা দেখতে পাই, যাকে আমরা কান বলে জানি, সেটার সংক্রমণ ও পচে যাওয়া।

কান পচার কারণ
কান পচা আমাদের দেশে খুবই স্বাভাবিক একটি ঘটনা। দুর্ঘটনায় কানে আঘাত লাগা, কামড়, কানে একাধিক দুল পরার জন্য ছিদ্র করা ইত্যাদি ঘটনার ফলে কান পচা নিয়ে হাসপাতালে প্রচুর রোগী আসে।

আমাদের কানের বাইরের অংশটি একটি নরম হাড়ের তৈরি কাঠামো। এটা চামড়ার নিচের অংশ থেকে পুষ্টি সংগ্রহ করে। কানে আঘাতের ফলে চামড়ার নিচের অংশ ও এই নরম হাড়ের মাঝে একধরনের তরল জমা হতে থাকে। দীর্ঘক্ষণ ধরে এই তরল জমা হয়ে থাকলে কানের নরম হাড় পুষ্টি পায় না এবং পচতে শুরু করে। আবার, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও জিনিসপত্র দিয়ে কানে একাধিক দুল পরার জন্য ছিদ্র করলে অনেক সময় কানের নরম হাড়ে পচন ধরে। এ ছাড়া কানের বাইরের অংশের সংক্রমণ, চর্মরোগের প্রতি অবহেলা, নিজের পরিচ্ছন্নতার প্রতি বেখেয়াল হলেও এ সমস্যা হতে পারে।

এই রোগের উপসর্গ
এ সমস্যার শুরুতে কান জ্বলতে পারে বা গরম লাগার অনুভূতি হতে পারে। কানের যে স্বাভাবিক নরম ভাব, তা চলে গিয়ে কিছুটা শক্ত অনুভূত হতে পারে। কানের বাইরের অংশ পুরোটা বা অংশবিশেষ ফুলে যেতে পারে। সবকিছুর সঙ্গে জ্বর বা গায়ে ব্যথাও থাকতে পারে।

কানের নরম হাড়ের কাঠামোটা টিকিয়ে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একবার পচন ধরে গেলে এটাকে থামানো কষ্টকর। আর এই নরম হাড়ের কাঠামো নষ্ট হয়ে গেলে কানের আর স্বাভাবিক আকার ফিরিয়ে আনা যায় না। কান কুঁচকে অনেকটা লাউ ফুলের মতো হয়ে যায়।

চিকিৎসা
কানের স্বাভাবিক আকার ফিরিয়ে আনার জন্য যে ধরনের অপারেশনের প্রয়োজন হয়, তা বেশ খরচের ও সময়সাপেক্ষ। আমাদের দেশে খুব বেশি জায়গায় সে ধরনের অপারেশন হয় না। তাই এ সমস্যা প্রতিরোধে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। প্রথমত, কানে একাধিক দুল পরার ছিদ্র করা থেকে বিরত থাকা। একান্তই করার ইচ্ছা থাকলে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে অথবা বিশ্বস্ত ও পরিচ্ছন্ন পারলারে করা উচিত। দুর্ঘটনার কারণে কানে আঘাত পেলে তা অবশ্যই দক্ষ কারও মাধ্যমে চিকিৎসা করানো উচিত। তাৎক্ষণিকভাবে দক্ষ কারও মাধ্যমে চিকিৎসা করানো সম্ভব না হলে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে দ্রুততম সময়ের মাঝে তা দক্ষ চিকিৎসকের মাধ্যমে ফলোআপ করানো উচিত। কানের আঘাতের সেলাই করার ক্ষেত্রে কখনোই কানের নরম হাড়ের ওপর সেলাই করা যায় না। এ ছাড়া দুর্ঘটনার ফলে কানে আঘাত পেলে তাতে দ্রুত বরফ বা ঠান্ডা পানি ঠেসে ধরা ভালো। এতে কানের নরম হাড় ও চামড়ার মধ্যবর্তী স্থানে তরল জমে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে।

কান পাকা যেহেতু মধ্যকর্ণের সংক্রমণ, তাই এতে কানের পর্দা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কান পাকা রোগের মধ্যে একটি ধরন আছে, যেখানে কান কিছুদিন শুকনা থাকে আবার কিছুদিন পরপর পাকে, পানি বা পুঁজ বের হয়। আবার আরেক ধরনের কান পাকা রোগ আছে, যেখানে কান কখনোই শুকায় না। যে ধরনের কান পাকা রোগে মাঝেমধ্যে কান শুকনা থাকে, সেসব ক্ষেত্রে আক্রান্ত কানটিতে পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে পর্দা লাগিয়ে ফেললে কান পাকার এই বিব্রতকর অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

কেন লাগাবেন কানের পর্দা
মূলত কান পাকা প্রতিরোধ করা, কানের ভেতরের প্রত্যঙ্গগুলোকে রক্ষা করা এবং শোনার ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা না গেলেও কিছুটা ভালো করার জন্যই কানে পর্দা লাগানো হয়। কানের পর্দা হলো পরিবেশ এবং মধ্যকর্ণের মাঝে একমাত্র দেয়াল। এটা না থাকলে কানের ক্ষমতা দিন দিন হ্রাস পেতে থাকে।
সাধারণত কানের আশপাশ থেকে চামড়ার নিচের কিছু অংশ নিয়ে পর্দার গ্রাফট তৈরি করা হয়। তারপর সেই গ্রাফটের ওপর পর্দা তৈরি হতে দুই সপ্তাহ থেকে এক মাস সময় লাগে। এ সময়ে যে চিকিৎসক নিয়মিত অপারেশন করেছেন, তাঁর কাছেই কান পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া দরকার। অপারেশনের আগে ও অন্তত তিন মাস পর পরীক্ষা করিয়ে শ্রবণশক্তির উন্নতি হয়েছে কি না তা দেখা যায়।

অপারেশনের ঝুঁকি
অপারেশনের কিছু ঝুঁকিও আছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাফট ফেইলর অর্থাৎ পর্দা তৈরি না-ও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কয়েক মাস পর আবার চেষ্টা করা যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শ্রবণশক্তি আরও কমে যেতে পারে। অপারেশন যেদিকে করা হয়েছে, সেদিকে জিবের পেছন ভাগের স্বাদ নেওয়ার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। কানে অপারেশনের পর কিছুদিন শোঁ শোঁ শব্দ হতে পারে। মাথা ঘোরানো ভাব হতে পারে। মুখের পাশে অবশ অবশ লাগতে পারে।

তবে আশার কথা হলো ঝুঁকি বা অপারেশন ফেইলর হওয়ার হার খুবই কম। আমাদের দেশে এখন বেশ অল্প খরচেই এই অপারেশন অনেক নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ সাফল্যের সঙ্গে করছেন। তাই অপারেশন প্রয়োজন হলে আশাবাদী হয়ে, বুকে সাহস নিয়ে এই অপারেশনে রাজি হতে পারেন। শুভকামনা থাকল।

Share

সর্বশেষ সংবাদ

Don't Miss

ডেন্টাল হেলথ সোসাইটির পক্ষ থেকে নতুন মহাপরিচালককে ফুলের শুভেচ্ছা

বাংলাদেশ ডেন্টাল হেলথ সোসাইটির কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃবৃন্দ নবনিযুক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হয়েছেন। গত ১২ মার্চ...

জিন নয়, দীর্ঘায়ু নির্ধারণে বেশি প্রভাব ফেলে খাদ্যাভ্যাস: গবেষণা

দীর্ঘজীবন অনেকেই ভাগ্য বা বংশগত জিনের ওপর নির্ভরশীল বলে মনে করেন। অনেকে বলেন, ‘আমাদের পরিবারে সবাই আগে মারা গেছে, তাই আমারও তাড়াতাড়ি যাওয়ার...

Related Articles

মার্কস ফার্টিলিটি সেন্টারের শুভ উদ্বোধন উপলক্ষে ফ্রি চিকিৎসা ক্যাম্প অনুষ্ঠিত

মার্কস ফার্টিলিটি সেন্টারের শুভ উদ্বোধন উপলক্ষে রাজধানীর মিরপুরে নারী ও বন্ধ্যাত্ব রোগীদের...

গর্ভকালীন জটিলতা: ১০টা প্রশ্নের সহজ উত্তর (Q&A)

গর্ভকালীন সময়ে অনেকেই বিভিন্ন শারীরিক পরিবর্তন ও জটিলতা নিয়ে চিন্তায় থাকেন। কোনটা...

কর্মক্ষেত্রের মানসিক চাপে বছরে ৮ লাখ ৪০ হাজার মৃত্যু: আইএলও

কর্মক্ষেত্রের দুর্বলভাবে পরিকল্পিত ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে সৃষ্ট মনঃসামাজিক সংকটে প্রতিবছর বিশ্বে...

প্রবীণদের পুষ্টি নিশ্চিতে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর

“জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ ২০২৬” উপলক্ষ্যে জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান, নিউট্রিশন সলিউশনস ও অর্গানিক...

বিদ্যমান সম্পদের অদক্ষ ব্যবহারই স্বাস্থ্য খাতের বড় সংকট : প্রতিমন্ত্রী

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেছেন, দেশের স্বাস্থ্য খাতে সম্পদের সীমাবদ্ধতার...

ঘুমের সমস্যা: ম্যাগনেসিয়াম ঘাটতি কি আসল কারণ?

বর্তমান ব্যস্ত জীবনে ঘুমের সমস্যা অনেকের কাছেই খুব সাধারণ একটি বিষয় হয়ে...

ঢাকার দুই সিটিতে টিকা দেওয়া হলে নিয়ন্ত্রণে আসবে হাম: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে শুরু হয়েছে হামের টিকাদান কর্মসূচি। এই দুই সিটিতে...

নারীদের হৃদরোগ বাড়ছে কেন? জেনে নিন লক্ষণ ও প্রতিকার

সাধারণত মনে করা হয় হার্টের অসুখ কেবল পুরুষদেরই বেশি হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক...