দীর্ঘজীবন অনেকেই ভাগ্য বা বংশগত জিনের ওপর নির্ভরশীল বলে মনে করেন। অনেকে বলেন, ‘আমাদের পরিবারে সবাই আগে মারা গেছে, তাই আমারও তাড়াতাড়ি যাওয়ার কথা।’
তবে সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, মানুষের আয়ু নির্ধারণে জিনের চেয়ে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকা অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুষম খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে দীর্ঘায়ু অর্জন সম্ভব-এমনকি পরিবারে দীর্ঘজীবনের ইতিহাস না থাকলেও।
জিন বনাম খাদ্যাভ্যাস: গবেষণা কী বলছে?
যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান লক্ষাধিক মানুষের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছে, মানুষের মোট আয়ুর মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ জিনগতভাবে নির্ধারিত হয়। বাকি ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ নির্ভর করে জীবনযাপনের ধরনে। আর সেই জীবনযাপনের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও সহজে পরিবর্তনযোগ্য উপাদান হলো প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাস।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যতালিকা বা ড্যাশ ডায়েটের মতো স্বাস্থ্যকর খাদ্যপদ্ধতি অনুসরণ করেন, তাদের মধ্যে হৃদরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার ও স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
আশ্চর্যের বিষয়, এই সুবিধা তারাও পেয়েছেন যাদের পরিবারে দীর্ঘজীবনের ইতিহাস নেই এবং যাদের জিনগত ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি। এতে প্রমাণিত হয়, সঠিক খাদ্যাভ্যাস জিনের সীমাবদ্ধতাকেও কার্যকরভাবে অতিক্রম করতে পারে।
কোন খাবার আয়ু বাড়ায়?
গবেষকেরা দীর্ঘায়ুর সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি খাদ্যগোষ্ঠী চিহ্নিত করেছেন-
শাকসবজি ও ফলমূল: প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে রঙিন শাকসবজি ও তাজা ফল খেলে শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের জোগান বাড়ে, যা কোষের ক্ষয় রোধ করে এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ কমায়। পালংশাক, গাজর, টমেটো, আম ও পেঁপে বিশেষ উপকারী।
গোটা শস্য ও ডালজাতীয় খাবার: লাল চাল, ওটস, মসুর ডাল, ছোলা ও শিমজাতীয় খাবার রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে, অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া বাড়ায় এবং দীর্ঘস্থায়ী শক্তি জোগায়।
স্বাস্থ্যকর চর্বি: জলপাই তেল, আখরোট, কাজুবাদাম এবং মাছে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখে ও মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা দীর্ঘদিন বজায় রাখতে সাহায্য করে।
প্রক্রিয়াজাত খাবার পরিহার: অতিরিক্ত চিনি, লবণ, ট্রান্স ফ্যাট ও প্রক্রিয়াজাত মাংস শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি করে, ইনসুলিন প্রতিরোধ বাড়ায় এবং কোষের বার্ধক্য ত্বরান্বিত করে।
খাদ্যাভ্যাস কীভাবে জিনকে প্রভাবিত করে?
বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো- সুষম খাদ্যাভ্যাস শুধু পুষ্টি সরবরাহই করে না, বরং জিনের কার্যপ্রণালিকেও প্রভাবিত করে। এপিজেনেটিক্স শাখার গবেষণা বলছে, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ক্ষতিকর জিনকে নিষ্ক্রিয় এবং সুরক্ষাকারী জিনকে সক্রিয় করতে পারে।
অর্থাৎ জন্মসূত্রে পাওয়া জিনের কিছু নেতিবাচক প্রভাবও প্রতিদিনের খাবারের মাধ্যমে আংশিকভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব- যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক যুগান্তকারী উপলব্ধি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের বোঝা দ্রুত বাড়ছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগে আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিবছর বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার অন্যতম প্রধান কারণ খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন। অথচ আমাদের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যতালিকায় ডাল, শাকসবজি, মাছ, ভাত ও মৌসুমি ফল- দীর্ঘায়ুর প্রায় সব উপাদানই রয়েছে। প্রয়োজন শুধু ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সচেতনভাবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে ফিরে আসা।
উপসংহার
বিজ্ঞান এখন স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে- ভাগ্য বা জিনের ওপর নির্ভর করে বসে থাকার সময় শেষ। আপনার প্রতিদিনের খাবারই হতে পারে সবচেয়ে শক্তিশালী ওষুধ এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যবিমা। সঠিক খাদ্যাভ্যাস মানে শুধু রোগমুক্ত থাকা নয়; বরং সুস্থ, সক্রিয়, আনন্দময় ও দীর্ঘ জীবন নিজের হাতে গড়ে নেওয়া। পরিবর্তনটা কঠিন নয়- দরকার কেবল সচেতনতা ও ইচ্ছাশক্তি। আজই শুরু হোক সেই পরিবর্তন, আপনার নিজের থালা থেকে।
ডা. শাহজাদা সেলিম
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়


