ডেঙ্গু এলো কোথা থেকে

Share

ডেঙ্গু শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার একাংশে এবার ডেঙ্গু জ্বর মহামারি আকার ধারণ করেছে। ফিলিপাইন, থাইল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে জরুরি অবস্থা জারি করেছে। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে এই ডেঙ্গু এলো কোত্থেকে?

স্প্যানিশ ডেঙ্গু শব্দ এ রোগের নামকরণ হয়। যার অর্থ হাড়ভাঙা জ্বর। তবে স্পেনে শব্দটি এসেছে পূর্ব আফ্রিকার সোহাইলি আদিবাসীদের কাছ থেকে। তাদের বিশ্বাস ছিল ‘খারাপ আত্মার সংস্পর্শে হাড়গোড় ভাঙার ব্যথাঅলা’ এ জ্বর হয়।

ইতিহাসে ডেঙ্গু মহামারীর প্রথম তথ্য জানা যায় চীনে। খ্রিস্টপূর্ব ২৬৫-৪২০ অব্দে জিন সাম্রাজ্যের সময় এ রোগের প্রাদুর্ভাবের কথা জানা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও ডেঙ্গু বিভিন্ন দেশে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে।

পৃথিবীতে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার প্রজাতির মশা রয়েছে। এদের মধ্যে এডিস এজিপ্টি সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। যাকে আমরা এডিস মশা বলি। এই মশাই ডেঙ্গুর ভাইরাসবাহী। এধরনের মশা ডেঙ্গু ছাড়াও জিকা ও চিকনগুনিয়ার বাহক। পরিষ্কার পানিতে জন্ম নেয়া স্বল্পায়ুর মশাই মুর্তিমান আতংক হয়ে দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিটিউট এর (আইইডিসিআর)প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, ডেঙ্গু জ্বর রোগটি প্রথম ১৯৫২ সালে আফ্রিকাতে দেখা যায়। পরবর্তীতে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ যেমন- ভারত, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার এবং ইন্দোনেশিয়াতে এটি বিস্তার লাভ করে।

সরকারি হিসেবে বুধবার (৩১ জুলাই) পর্যন্ত চলতি বছর বাংলাদেশে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়েছে ১৭ হাজার ১৮৩ জন। এর মধ্যে নব্বই শতাংশই চলতি মাসে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৪৭৭ জন। এর মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালেই ৯২৮ জন।

সরকারি হিসেবে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে এ বছর অন্তত ১৭ জন মারা যাওয়ার খবর প্রকাশ করা হয়েছে। তবে গণমাধ্যম ও অন্যান্য তথ্যমতে মৃতের সংখ্যা অর্ধশতাধিক।

মহামারি এ রোগ বাংলাদেশে এবারই প্রথম নয়। এর শুরুটা হয়েছিল ১৯৬২ সালে। প্রথমে অবশ্য এই জ্বরটি ঢাকায় একসঙ্গে অনেকের হয়েছিল বলে এর হয়ে যায় ‘ঢাকা ফিভার’। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এটি ডেঙ্গুজ্বর বলে শনাক্ত করেন।

এরপর দীর্ঘ সময় বিরতি দিয়ে ২০০০ সালে ফের বাংলাদেশে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এরপর থেকে কোনো বছর বাড়ছে আবার কোনো বছর কমছে ডেঙ্গু রোগী। বিগত ১৯ বছরের মধ্যে চলতি বছরই ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে শুরু করে গত বছর পর্যন্ত ১৯ বছরে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন ৫০ হাজার ১৭৬ জন। মারা গেছেন ২৯৬ জন। সব মিলিয়ে ডেঙ্গু শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৬৭ হাজার এবং মারা গেছেন ৩১০ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখান অনুযায়ী, ২০০০ সালে দেশে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছিলেন ৫৫৫১ জন এবং মারা গেছে ৯৩ জন। এরপর ২০০১ সালে আক্রান্ত ২৪৩০ জন এবং মারা গেছে ৪৪ জন। ২০০২ সালে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ২৩২ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়। ২০০৩ সালে আক্রান্ত হয়েছেন ৪৮৬ জন এবং মারা গেছে ১০ জন। ২০০৪ সালে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৪৩৪ জন এবং মারা গেছে ১৩ জন। ২০০৫ সালে আক্রান্ত হয়েছেন ১০৪৮ জন এবং মারা গেছে ৪ জন।

২০০৬ সালে আক্রান্ত হয়েছেন ২২০০ জন এবং মারা গেছে ১১ জন। ২০০৭ সালে আক্রান্ত হয়েছেন ৪৬৬ জন, ২০০৮ সালে ১১৫৩ জন, ২০০৯ সালে ৪৭৮ জন এবং ২০১০ সালে ৪০৯ জন আক্রান্ত হলে কেউ মারা যাননি। এর পর ২০১১ সালে আক্রান্ত হয়েছেন ১৩৫৯ জন এবং মারা গেছে ৬ জন, ২০১২ সালে আক্রান্ত হয়েছেন ৬৭১ জন এবং মারা গেছে ১ জন।

২০১৩ সালে আক্রান্ত হয়েছেন ১৭৪৯ জন এবং মারা গেছে ২ জন। ২০১৪ সালে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৭৪ জন এবং কেউ মারা যাননি। ২০১৫ সালে আক্রান্ত হয়েছেন ৩১৬২ জন এবং মারা গেছে ৬ জন। ২০১৬ সালে হঠাৎ করে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ৬ হাজার ৬০ জনে বেড়ে যায়। সে বছর ডেঙ্গুতে মারা যায় ১৪ জন।

২০১৭ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৭৬৯ জন। মারা যায় ৮ জন। ২০১৮ সালে আক্রান্ত হয়েছেন ১০১৪৮ জন এবং মারা গেছে ২৬ জন। ২০১৯ সালে (৩১ জুলাই পর্যন্ত) আক্রান্ত হয়েছে ১৭ হাজার ১৮৩ জন এবং মারা গেছেন ১৭ জন। চলতি বছর শেষ নাগাদ মৃতের সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

অন্যান্য বছর যেখানে কিছু জেলা এ রোগের আওতামুক্ত থাকতো, এ বছর দেশের ৬৪টি জেলায় তা প্রকোট আকার ধারণ করেছে। ফলে সরকারি ও বেসরকারিভাবে নেয়া সব উদ্যোগ যেন ভেস্তে যাচ্ছে। ফলে, দিন যত যাচ্ছে আক্রান্তের সংখ্যা ততোটাই বাড়ছে।

Share this news as a Photo Card

Share

সর্বশেষ সংবাদ

Don't Miss

নারীদের হৃদরোগ বাড়ছে কেন? জেনে নিন লক্ষণ ও প্রতিকার

সাধারণত মনে করা হয় হার্টের অসুখ কেবল পুরুষদেরই বেশি হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা বলছে উল্টো কথা—পুরুষদের তুলনায় নারীদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি এখন...

হামের উপসর্গ নিয়ে রাজশাহী মেডিকেলে মারা যাওয়া শিশুর সংখ্যা বেড়ে ৫০

প্রতিদিনই বাড়ছে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা। চলতি বছরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া শিশুর সংখ্যা...

Related Articles

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীদের জন্য এআই বিষয়ক সেমিনার ও সনদ প্রদান অনুষ্ঠান

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ডিআইইউ) আজ (শনিবার) সাভারের বিরুলিয়ায় অবস্থিত ড্যাফোডিল স্মার্ট সিটিতে...

স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক ৩ ব্যায়াম, নিয়মিত অভ্যাস করুন আজ থেকেই

নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এমন ক্যানসারগুলোর একটি হলো স্তন ক্যানসার।...

চীন-পাকিস্তান আমাদের চিকিৎসকদের জন্য দুয়ার খুলে দিয়েছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, বাংলাদেশি চিকিৎসকদের...

তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্রি সেমিনার অনুষ্ঠিত

তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য, শারীরিক সুস্থতা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি...

চার সরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ছাত্রদলের নতুন কমিটি

ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ চার সরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে নতুন আহ্বায়ক কমিটি...

01 August 2019

ডেঙ্গু এলো কোথা থেকে

Shastho.TV |
ShasthoTV
ShasthoTV