শারীরিক অসুস্থতার মতোই মানসিক অসুস্থতাও অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয়। কিন্তু সামাজিক ট্যাবু ও অসচেতনতার কারণে আমাদের দেশে সিংহভাগ মানুষই মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বাইরে থেকে যান। এই বাস্তবতা বদলাতে ও মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সফল কর্পোরেট ক্যারিয়ার ছেড়ে উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন ইবনুল করিম রূপেন। তার হাত ধরেই গড়ে উঠেছে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘লেটস টক’। সম্প্রতি এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি শুনিয়েছেন তার ক্যারিয়ার পরিবর্তন, প্রতিষ্ঠানের সেবাসমূহ এবং চার বছরের পথচলার আবেগঘন নানা অভিজ্ঞতার কথা।
নিজের ক্যারিয়ারের পেছনের গল্প বলতে গিয়ে ইবনুল করিম রূপেন জানান, অ্যাড এজেন্সি দিয়ে শুরু করে পরবর্তীতে একটি সফটওয়্যার কোম্পানির এক্সিকিউটিভ থেকে ‘হেড অব মার্কেটিং’ হিসেবে সফলতার সকল দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। কিন্তু মনের ভেতর কাজ করত নিজের কিছু করার তাগিদ।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অফিসে টিমের সদস্যদের শুধু কাজের পারফরম্যান্স নয়, মেন্টালি বা মানসিকভাবে গাইড করতে আমি খুব ভালোবাসতাম। কেউ কোনো চ্যালেঞ্জে পড়লে আমি তাদের কাউন্সেলিং ও গ্রুমিং করতাম। এখান থেকেই মেন্টাল হেলথের প্রতি আগ্রহ শুরু।’
পরবর্তীতে কোভিডের সময় এক আশঙ্কাজনক পরিসংখ্যান তাকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। কোভিডের প্রথম এক বছরে বাংলাদেশে ভাইরাসে যত মানুষ মারা গেছেন, তার চেয়ে দ্বিগুণ মানুষ আত্মহত্যা করেছিলেন। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বিবিএ ও এমবিএ সম্পন্ন করা রূপেন সিদ্ধান্ত নেন ‘লাইফ কোচ’ হিসেবে কাজ করার। তিনি নিজে লাইফ কোচিং এবং টিমে অভিজ্ঞ ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের যুক্ত করে প্রতিষ্ঠা করেন ‘লেটস টক’ (Let’s Talk), যেন এক ছাদের নিচেই মানুষ লাইফ কোচিং ও থেরাপি দুটো সেবাই পেতে পারেন।
৯২% মানুষ সেবার বাইরে: ভাঙতে হবে সামাজিক ট্যাবু
দেশে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতার চিত্র তুলে ধরে রূপেন দীর্ঘ আলোচনায় তরণ এই উদ্যোক্তা বলেন, সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশে প্রায় ৯২% মানুষ মানসিক স্বাস্থ্যসেবার আওতার বাইরে রয়ে গেছেন। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে সামাজিক ট্যাবুকে দায়ী করে তিনি বলেন, ‘‘আমরা মনে করি মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা মানে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করা, বা ‘পাগল’ হওয়ার ভয় পাওয়া। অথচ শারীরিক অসুস্থতার মতো মানসিক অসুস্থতাও স্বাভাবিক। সামান্য জ্বর বা মাথা ব্যথা হলে আমরা সবাইকে বলি, কিন্তু মানসিক স্ট্রেসের কথা বলতে দ্বিধা করি। এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পরিবার ও কাছের মানুষদের সচেতন হতে হবে। কেউ দীর্ঘদিন ধরে মন খারাপ করে থাকলে বা স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ছন্দ হারালে তাকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।’’
‘লেটস টক’-এর ৪টি বিশেষ সেবা
বর্তমানে চার বছরের বেশি সময় ধরে ‘লেটস টক’ প্রধানত চার ধরনের সেবা দিয়ে প্রদান করেন। যথা:
১. কাউন্সেলিং: স্ট্রেস, দুশ্চিন্তা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, ক্যারিয়ারের সিদ্ধান্তহীনতা বা ফোকাস ধরে রাখার মতো দৈনন্দিন জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় স্বল্পমেয়াদী সেবা প্রদান।
২. সাইকোথেরাপি: মানসিক সমস্যা দীর্ঘমেয়াদী রূপ নিলে, কিংবা ট্রমা, ওসিডি , পিটিএসডি , এডিএইচডি ও বাইপোলার ডিসঅর্ডারের মতো জটিলতায় ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী থেরাপি দেওয়া।
৩. লাইফ কোচিং: এলোমেলো ক্যারিয়ার বা ব্যক্তিগত জীবনের স্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ এবং তা অর্জনে স্টেপ-বাই-স্টেপ গাইডলাইন প্রদান।
৪. কর্পোরেট ওয়ার্কশপ: স্ট্রেসফুল কর্পোরেট জীবনে কর্মীদের মানসিক চাপ কমানো এবং প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যের সঙ্গে নিজের ক্যারিয়ারের লক্ষ্য মিলিয়ে পারফর্ম করার বিশেষ মাইন্ডসেট তৈরি করা।
চার বছরের পথচলা ও সাফল্যের অবিশ্বাস্য গল্প
চার বছরের পথচলায় ‘লেটস টক’-এর ঝুলিতে জমা হয়েছে অনেক আবেগঘন ও অবিশ্বাস্য সাফল্যের গল্প। তেমনই একটি অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে ইবনুল করিম রূপেন বলেন, ‘আমার এক ক্লায়েন্ট ছিলেন আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ফার্স্ট অফিসার (পাইলট)। রানওয়েতে প্লেন নেওয়ার ঠিক মুহূর্তে তার পার্টনার তাকে ডিভোর্সের মেসেজ পাঠান। আকাশে তখন ২৬০ জনের বেশি যাত্রী, অথচ উনি প্রচণ্ড দুশ্চিন্তাতে ভুগছিলেন। ওই অবস্থাতেই উনি আমাকে টেক্সট করেন। আমি উনাকে ককপিট থেকে বের হয়ে গিয়ে কল করতে বলি। মাত্র ৩-৪ মিনিটের সেশনে উনাকে শান্ত করি। উনি প্লেন টেক-অফ করেন এবং আকাশে উঠে স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের মাধ্যমে আমাকে ধন্যবাদ জানান। এই ঘটনাটি আমাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল যে, আমি মানুষের চরম সংকটকালে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারছি।’
শুধু তাই নয়, বিদেশে পিএইচডি সম্পন্ন করা অনেক প্রবাসী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ যখন নিজেদের সাফল্যের সব ক্রেডিট লাইফ কোচ হিসেবে রূপেনকে দিতে চান, তখন তিনি বিনয়ের সাথে বলেন,‘সব প্রশংসা মহান আল্লাহর। আমি হয়তো একটু গাইডলাইন বা মনিটর করি, কিন্তু মূল কাজটা সেই মানুষটাই করে।’
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সরকার ও সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে রূপেন আহ্বান জানান, নিজেদের সমস্যা নিয়ে সাহায্য চাইতে সংকোচ না করা এবং চারপাশে কেউ ভেঙে পড়লে তাকে পেশাদার থেরাপি বা কাউন্সেলিং গ্রহণে সাহস যোগানোই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য।
সবশেষে এনটিভি অনলাইনকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি জানান, সপ্তাহের সাত দিনই ‘লেটস টক’-এর কার্যক্রম চালু থাকে। অনলাইন ও অফলাইন-উভয় মাধ্যমে কাউন্সেলিং সেবা নেওয়া যায়। সেবা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ কিংবা হটলাইন ০১৩১৩-৯৬৫৫১১ নম্বরে যোগাযোগ করা যাবে।


