প্রধান খবরস্বাস্থ্য সংবাদ

ডেঙ্গুর সবচেয়ে ক্ষতিকর ধরন শনাক্ত, আক্রান্ত ঢাকার রোগীরা

Share
Share

দেশে ডেঙ্গু রোগের নতুন একটি ধরন শনাক্ত হয়েছে। এই ধরনটির মাধ্যমে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন ঢাকার রোগীরা। ডেঙ্গুর সবচেয়ে ক্ষতিকর ধরনগুলোর একটি ডেনভি–৩–এ বাংলাদেশের মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা বলেছেন, ডেঙ্গুর এই ধরনের কারণে দ্রুত রোগীদের রক্তের কণিকা প্লাটিলেট কমে যাচ্ছে। সে কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিরা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাদের হাসপাতালে নিতে হচ্ছে।

দেশে এবারের ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবে ভাইরাসটির একটি সেরোটাইপ বা ধরনকে দায়ী করছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা বলছেন, এই সেরোটাইপের নাম ডেনভি–৩। এর কারণেই দেশে এ বছর ডেঙ্গু রোগে মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, দিন দিন বাড়ছে রোগীর সংখ্যা।

ডেঙ্গু ভাইরাসের জিন–নকশা (জিনোম সিকোয়েন্স) বের করে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) জিনোমিক গবেষণাগারের বিজ্ঞানীরা এসব কথা জানিয়েছেন। আজ রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ‘ডেঙ্গু ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সের তথ্য উন্মোচন’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানানো হয়।

অনুষ্ঠানে গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান গবেষক ড. সেলিম খান।

বিসিএসআইআরের চেয়ারম্যান মো. আফতাব আলী শেখ সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। তিনি বলেন, এ বছরের জুলাইয়ে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব শুরু হলে ডেঙ্গুর ব্যাপকতা নির্ধারণের জন্য এই ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স কার্যক্রম শুরু হয়। ঢাকার একটি হাসপাতাল থেকে ২০ জন ডেঙ্গু রোগীর কাছ থেকে নমুনা নিয়ে জিনোম সিকোয়েন্স করা হয়েছে।

আফতাব আলী শেখ জানান, ডেঙ্গুর নমুনাগুলো জিনোম সিকোয়েন্স করে প্রতিটিতেই ডেনভি–৩ সেরোটাইপ মিলেছে। তবে ডেঙ্গুর মিউটেশনবিষয়ক উল্লেখযোগ্য গবেষণা না থাকায় এই ভাইরাসের সংক্রমণের প্রভাব শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, ডেঙ্গু হওয়ার পর রক্তের প্লাটিলেট দ্রুত নেমে যাচ্ছে, আগে যেটা ধীরগতিতে নামত। ৯৫ শতাংশ রোগী ঢাকার। শিশুরাও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে। উপসর্গও ভিন্ন ভিন্ন পাওয়া যাচ্ছে। ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স করা হলে ভাইরাসটির বৈশিষ্ট্য আরও ভালোভাবে জানা যাবে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপ—ডেনভি–১, ডেনভি–২, ডেনভি–৩ ও ডেনভি–৪। ২০১৬ সালের আগে দেশে ডেনভি–১ ও ডেনভি–২ দ্বারা মহামারি সংঘটিত হয়। বাকি দুটি সেরোটাইপ দেশে তখনো শনাক্ত হয়নি। ২০১৭ সালে দেশে প্রথম ডেনভি–৩ শনাক্ত হয়। এর পরের বছর ২০১৮ সালে ডেনভি–৩ সংক্রমণের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং ২০১৯ সালে এটি মহামারি আকার ধারণ করে। সে বছর বিসিএসআইআর ডেঙ্গু ভাইরাসের একটি নমুনার জিনোম সিকোয়েন্স করেছিল।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব জিয়াউল হাসান বলেন, প্রাণীর শরীরের জিনে সব জিনগত তথ্য থাকে। জিনোম সিকোয়েন্স করলে বিশেষ বৈশিষ্ট্য উন্মোচন করা যায়। এতে জিনগত ত্রুটি নির্ণয় ও নির্মূল করা সম্ভব হয়।

জিনোমিক গবেষণাগারের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. সেলিম খান সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপনা করেন। গেটসনোটসের এক পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, পৃথিবীতে মশার কামড়ে মানুষের বেশি মৃত্যু হয়। মশার কামড়ে প্রতিবছর মারা যায় ৭ লাখ ২৫ হাজার, সেখানে মানুষের দ্বারা মানুষ খুন হয় ৪ লাখ ৭৫ হাজার। আর সাপের কামড়ে মারা যায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষ।

মো. সেলিম খান বলেন, ডেনভি–৫ বা ৬ সামনে আসতে পারে। প্রাকৃতিকভাবেই ভাইরাসটির রূপান্তর (মিউটেশন) হয়েছে। এবার ডেঙ্গু অন্যান্যবারের চেয়ে ভয়াবহ। এবার দেখা যাচ্ছে, খুব তাড়াতাড়ি রক্তের প্লাটিলেট পড়ে যাচ্ছে, রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সাইফুল্লাহ মুন্সি। তিনি বলেন, ডেনভি–১–এ আক্রান্ত হলে শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে ওই ব্যক্তি ডেনভি–২, ৩ ও ৪–এ আক্রান্ত হলে আগের ওই রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা উল্টো ক্ষতিকারক হয়। এর জন্য নিয়মিত ডেঙ্গু ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স করা দরকার।

অধ্যাপক সাইফুল্লাহ মুন্সি বলেন, জিনোম সিকোয়েন্স করে জানা গেল, দেশে ডেনভি–৩ দিয়ে প্রাদুর্ভাব হচ্ছে। এই শনাক্তকরণ পিসিআর পদ্ধতিতে সম্ভব হয় না। এর জন্য জিনোম সিকোয়েন্স করা লাগে। ডেঙ্গুর টিকা গবেষণায় এটি কাজে আসবে।

কতটা মারাত্মক, এমন প্রশ্নে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, ‘ভয়াবহতার দিক দিয়ে ডেনভি–২ ও ডেনভি–৩ বেশি ভয়াবহ, অন্য দুটির চেয়ে। ভয়াবহতা কমবেশি হয়। কারণ, জিনোম সিকোয়েন্সে দেখা যায়, কিছু কিছু প্রোটিন এই দুই সেরোটাইপে আলাদা। এ কারণে ক্ষতিকারক।’

জিনোমিক গবেষণাগারের সাতজন বিজ্ঞানী ডেঙ্গু ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সের গবেষণা চালান। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদেরা এ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত আছেন। ডেঙ্গু ভাইরাসের একেকটি নমুনা জিনোম সিকোয়েন্স করতে ৭০ হাজার টাকা করে প্রায় ১৪ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বিসিএসআইআরের সদস্য (প্রশাসন) মুহাম্মদ শওকত আলী, সদস্য (উন্নয়ন) মোহাম্মদ জাকের হোছাইনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

Share this news as a Photo Card

Share

সর্বশেষ সংবাদ

Don't Miss

ভারতে হাসপাতালের আইসিইউতে ভয়াবহ আগুন, ১০ রোগীর মৃত্যু

ভারতের ওড়িশার কটক শহরের এসসিবি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ট্রমা সেন্টারের আইসিইউতে আগুন লেগেছে। এতে অন্তত ১০ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার (১৬ মার্চ)...

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এসি হঠাৎ চালু করলে বিপদ হতে পারে

যে কোনো কারণেই হোক, অনেকদিন এসি বন্ধ থাকলে, ছাড়ার আগে সার্ভিসিং করানো জরুরি।

Related Articles

নবজাতকের জীবন রক্ষায় আশার আলো কেএমসি: বিএমইউ উপাচার্য

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) আন্তর্জাতিক ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার (কেএমসি) সচেতনতা দিবস ২০২৬...

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের বৈঠক অনুষ্ঠিত

অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খানের নেতৃত্বে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সদস্যবৃন্দ...

এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানির এমডি হলেন আশরাফুজ্জামান

সরকারি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল)-এর নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক...

কর্মক্ষেত্রের মানসিক চাপে বছরে ৮ লাখ ৪০ হাজার মৃত্যু: আইএলও

কর্মক্ষেত্রের দুর্বলভাবে পরিকল্পিত ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে সৃষ্ট মনঃসামাজিক সংকটে প্রতিবছর বিশ্বে...

প্রবীণদের পুষ্টি নিশ্চিতে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর

“জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ ২০২৬” উপলক্ষ্যে জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান, নিউট্রিশন সলিউশনস ও অর্গানিক...

বিদ্যমান সম্পদের অদক্ষ ব্যবহারই স্বাস্থ্য খাতের বড় সংকট : প্রতিমন্ত্রী

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেছেন, দেশের স্বাস্থ্য খাতে সম্পদের সীমাবদ্ধতার...

দেশে প্রথম নভো নরডিস্কের আধুনিক ইনসুলিন কার্ট্রিজের উৎপাদন শুরু করল এসকেএফ

বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ কোম্পানি এসকেএফ প্রথমবারের মতো দেশে নভো নরডিস্কের বিশ্বমানের আধুনিক...

স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতি রোধে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতি রোধ করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার...

২৯ আগস্ট ২০২১

ডেঙ্গুর সবচেয়ে ক্ষতিকর ধরন শনাক্ত, আক্রান্ত ঢাকার রোগীরা

Shastho.TV |
ShasthoTV
ShasthoTV